পাঠকামি -১
বই কিনি, বই পড়ি, একটা দুটো কাছে পিঠে রাখি । দিল্লিতে বেশ
কইয়েকটি বাংলা বইয়ের দোকান আছে, বছরে একবার বাংলা বইমেলাও হয় । কিন্তু বইমেলা নিয়ে
অনেকদিন ধরে পরিষ্কার কোন ছবি আঁকতে পারছিলাম না, এটা স্বাভাবিকই, বৃহত্তর কলকাতা
বইমেলার আবেগের সাথে পরিচিত ছিলাম না । মেলা বলতে শুধু বই কেনা বেচা দেখে এসেছি । তার সাথে জড়িত কবি,
সাহিত্যিক, প্রকাশকদের একাত্মা হয়ে যাওয়া, পাঠকএর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া,মেলা
শেষের ঘন্টা ধ্বনির সাথে চোখের জল মিশিয়ে দেওয়া ব্যাপারটা অনুভব করলাম এবার ।
কলকাতা বইমেলা থেকে ফিরে এলাম অনেকগুলি স্মৃতি ও বই সংগ্রহ করে ।
বেশীর ভাগ বইই পড়া হয়ে ওঠেনি, এক একটা বই হাতে নিচ্ছি, দু
পাতা পড়ার পরে অফিসের কাজগুলি এমন ভাবে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ে! আজকাল খুব কাজের চাপ,
বহুজাগতিক এই সব কোম্পানির উদারতায় আমরা বিশ্ববাজারে পণ্য হয়ে যাচ্ছি, আজকাল লোকে
আমাদের নিয়ে কবিতাও লিখছে । পণ্য হয়ে থাকতে খারাপ লাগে না, তবে একটু শিল্পের স্বাদ
পেলেও খারাপ হয় না, সুতরাং আবার একটা বই হাতে তুলে নিই ।
বইঃ রঞ্জনরশ্মি – রঞ্জন মৈত্র
কলকাতা বইমেলায় এইবার প্রথম । নতুন কবিতার স্টলে যখন
ঢুকলাম, সবই অচেনা মুখ । ভাস্বতী দি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ইনি প্রদীপ, ইনি
সব্যসাচী, ইনি প্রশান্ত দা, ইনি রঞ্জন দা ...এক নজরে মনে হলো, রঞ্জন দা কে আগে
কোথাও দেখেছি । একটু ভেবে নিলাম, কোথায় ? নাহ, কোথাও দেখিনি তো ? রঞ্জনরশ্মি বইটা
হাতে নিয়ে ভাস্বতী দি বলছিলো, এটাই আমাদের বাইবেল, সংগে সংগে বইটা আমি কিনে নিলাম
। রঞ্জন বোধহয় আমাকে ভাস্বতী দির কাছে শুনে
শুনে আমাকে চিনে নিয়েছেন, আমাকে একটা বই ‘কলোকাল ট্রেন’ সাথে সাথে উপহার ও দিলেন ।
মেলা শেষে ফিরে এসেছি দিল্লিতে, অনেক বড় বড় কবিদের সাথে পরিচইয়ের স্মৃতি ফিকে হয়ে
আসেনি । কিন্তু আমারই ব্যর্থতা , আমি সময় করে তাদের বই পড়ে মতামত ও জানিয়ে উঠতে
পারিনি ...
তবে, আজ হাতে নিয়ে একরাশ রঞ্জন, আলো উপচিয়ে পড়ছে সারা ঘর,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রশ্মির ছাঁট, পড়ছি ‘আমার আজান’ ।
‘খাটের তলায় জমে যাচ্ছে রোদ
/ এবার বেচে দেবো কিছুটা করে’
‘আলোক পিপাসু’ থেকে ......
বানভাসি/ঘৃণা ও মমতা,
সম্পর্কহীনতার দিকে ভেসে/যায় ইমনকল্যান, নেভানো শ্মশান তাই ঝাপসা বড়ো ঝাপসা হয়ে
যায় ।
ভাবছি কবেকার লেখা ? ১৯৮৮ সালের দিকে হবে হয়তো, কি দারুন
পরিপক্কতা, রঞ্জন দার এই লেখাগুলির আজও আকর্ষনক্ষমতা হারায় নি, আজও তা আপেক্ষিক ও
প্রাসঙ্গিক ।
‘সুবর্ন রেখা রানওয়ে’ অনেক আলোচিত বই, আমি আগে কখনো পড়িনি ।
তার জন্য কবি বা কবিতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়না, আমি অনেক পরে এই পড়া ব্যাপারটায় এসেছি । তাই
শেষের পাতাগুলি থেকে পড়া শুরু করলাম, চোখ আটকে গেল ‘জলছুট’ কবিতায়-
‘উপরে তাকাই, ময়লা
প্লাস্টিক, পায়ের দিক থেকে প্লাস্টিক হয়ে উঠেছে...কবে সবুজ দেবার কথা দানা কথা হবে
কোঠা ও ক্যানেলে’
এখানে ‘দানা’ কথাটা আমি এই যুগে বসে একটু ভাবছি, আমরা কি
মেইন মুদ্দা থেকে হারিয়ে যাচ্ছি ? আরো অনেক কবিতা ভালো লেগেছে, ‘ঝাঁঝার চেয়েও’, ’স্ক্রু’,
‘মনসুন’, ’আমার মোরগ’, ’অনুবাদে উদ্বাস্তু দিন’, ’মেরুপাখি’, ’পিকনিক’ ,আরো, আরোও
অনেক কবিতা ।
‘সেভেন বেলোর বাড়ি’ এই কিছুদিন আগে শুননাম এক বন্ধু
নীলাব্জের কাছে, পরে জানতে পারলাম এটা আবার রঞ্জনরশ্মির বইয়ের মধ্যেই আছে ।সুতরাং
একটু আলাদা উতসাহ অনুভব করছি, এক্সাক্টলি...
‘প্রাণ’ থেকে
‘এক মুঠো আঙুল থেকে ফস্কে
যায়/পালকের সম্ভাবনাগুলো’
এরকম একটা ভাবনা হঠাৎই আসে...কিন্ত কাকতলীয় ভাবে কখনোই আসে
না, কলমের আশে পাশে তার হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় আর রঞ্জনদার মাপের কবিরা তাকে লিখে
ফেলে । ওরা কলম থেকে আবার পালক হয়ে যায় । ওরা প্রান পায় । পড়ছি ‘সুইমিং পুল’
‘ঝাঁপিয়ে পড়ছে রঙ্গীন
মাটিরা সারশোয়া ছায়ার/ উপর । গ্লুকন সরোবরের পাশে চোখে অফসেট সকাল’
এ যেন আমারই জীবন যাত্রার ,দিন কখন যে দুপুর হয় আমার
পাকস্থলী এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি । যেটা টের পায় প্যান-ডি জাতীয় পেন্টাপ্রাজল
গুলো । আরো বেশ কয়েকটি কবিতা উল্লেখ করা
যায় যেমন ‘অনুরোধের আসর’, ‘সিলেবাস’,’শ্রীলার রান্নাঘর’, ‘পক্ষী নিবাস’, তাতে শুধু
তালিকা বাড়ে, আর আসলে তালিকা টা অনেক লম্বা । মোটামুটি নীলাব্জের সাথে একমত,
‘সেভেন বেলোর বাড়ি’ আমার কাছে সেরা মনে হয়েছে ।
‘কলোকাল ট্রেন’ –তাহলে আমার কাছে দুটি কপি হলো ।রঞ্জনদা
একটা আমাকে উপহার হিসাবে দিয়েছেন আর একটা এই বইয়ের মধ্যেই । কিন্তু এবার
ব্যাপারটা আরো ধুঁয়াশা হোলো, রঞ্জনদা জানতেন
যে রঞ্জনরশ্মি বইটায় ‘কলোকাল ট্রেন’ বইটা ইনক্লুডেড আছে, তবু কেন এই বইটাই আমাকে
দিলেন ? নাকি এটা তার প্রিয় বই ? যা হোক, খুলে দেখি...
‘দরবারী’
কবিতাটার নামকরণ দেখেই তরবারীর কথাটা মনে এলো, শিরোচ্ছেদ
কথাটাও । এই প্রসঙ্গে আরো একটা কথা মনে এলো তা হোলো, আমার বড়দা পলাশকান্তি বিশ্বাস
রঞ্জন দার পুর্ব-পরিচিত । বড়দা যে দিন আমার সাথে দেখা করতে বইমেলাতে আসেন, সেদিন
আমার সাথে রঞ্জনদা কে দেখে অবাক, রঞ্জন দাও পলাশদা কে দেখে অবাক । আমি বড়দা কে
জিজ্ঞেস করলাম , চেন নাকি ? দাদা বল্লেন, ‘হ্যা- উনি তো কঠিন লেখার মাস্টার’... না
এবার বেঁচে গেলাম । ট্রেন থেকে নেমে এলো সহজ ভাষার ভীড়, আর সবুজ তরি-তরকারি,
সাধারন মানুষদের প্রতিদিনের কথা দিয়ে সাজনো এক অমায়িক কবিতা । এই ‘দরবারি’ কবিতা
থেকে
‘সুঁই থেকে সিরাম থেকে বেরিয়ে
আবার শূন্যতটে/ হাতুড়ির গানটুকু একা হেঁটে যায়...’
বাকি বইটা এমনি তে বোঝা হয়ে যায়, ভালো । সত্যি তো, এই বইটি
দু বারই পড়া যায় ।
‘আলোতোয়া অডিও মঞ্জরী’ আর একটা বই, এটা বোধহয় লেটেস্ট! দেখে
নিই ‘উৎসার’
‘গলা প্যস্টেল থেকে / ছিটকে
ওঠে পাথর / ক্রমে আলোরূহ আলোঝরা / হাতঘড়ির অচেনা সি-শার্প’
এ যেন টিক টিক শব্দে বয়ে চলা জীবনগতি ; আমাদের আশেপাশে ঘিরে
রয়েছে । ছবিগুলি ছায়াছবির মত ! কল্পনা মিশিয়ে শুরু হয়, বাস্তবের স্পর্শ দিয়ে শেষ
হয়, কিংবা কখনো শেষ হয় না ।
‘কথার ঢালুতে এই ডাক হরতাল
/এ ভাবে মহিম হয়ে যায়...।লাগোয়া পুকুর ফুঁড়ে সূর্য ওঠে/ ওড়া ছাই ভেঙে ওড়ে
শুকনালি/ঠোট ভেঙে হু হু নামে ঘাস ও ভেড়ারা’ ।
সুতরাং এইখানে শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ, আবার আসব অন্য কোন
পাঠের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ।
পাঠকামি -২
সব্যসাচীর সাথে নতুন কবিতার স্টলেই দেখা । উজ্বল, সপ্রতিভ,
সটান, দীর্ঘ নাসিকা, স্পষ্ট আওয়াজ । নাম শুনলাম, মনে হলো, যথাযথ ; পরিচয় হোলো ।
উনি বল্লেন, ‘পসিবিলিটি ও টিলিবিসিপ পড়েছেন ?’, আমি বুঝতে পারলাম না, হাতড়াচ্ছিলাম
‘পসিবিলিটি ও......টিইইইইইইইইইসি ?’ উনি আবার বল্লেন, ‘পসিবিলিটি ও টিলিবিসিপ
পড়েছেন ?’, আবার বুঝতে পারলাম না , কিন্তু ভাবখানা এমন করলাম, যেন বুঝতে পেরেছি ।
তাতে কারো কি ক্ষতি হোলো তা হিসেব করিনি । কিন্তু একটু বন্ধু বন্ধু ভাব হয়ে গেলো ।
বল্লাম আমি দিল্লি থেকে এসেছি, পেশায় সফটওয়ার ইঞ্জিনীয়ার । এবার একটা পসিবিলিটি দেখা
গেলো । সব্যসাচী ও তার সহকর্মীরা একটা ওয়েব সাইট হোস্ট করেছেন, তাতে তাদের সফটওয়ার
বিষয়ক সহায়তা চায় । আমার চাই কবিতা, কবিতা বিষয়ক পরিচিতি । জানতে চাইলাম বিস্তারিত
প্রোজেক্ট টা কি? । টিলিবিসিপ হলো । শব্দটাও পরিষ্কার হোলো । পরের দিন সবসাচী
হাজরা আমাকে এই বইখানি উপহার দিলেন । বইটা খোলা যাক ।
বইঃ পসিবিলিটি ও টিলিবিসিপ – সব্যসাচী হাজরা
‘দান্তের পয়লা-বৈশাখে’
‘এক্স ও এক্সট্রা গলিপথে /
তোমার ওপেনারে চা পড়ে থাক / ছাত্ররা খেয়ে যাবে ‘
এত বিদ্যা এখনো আয়ত্ব করে উঠতে পারিনি যে, বলি এটা একটা
যুগোত্তীর্ন লেখা, কিন্তু এটা বোঝার মত বয়স হয়ে গেছে যে যুগ পালটে গেছে । কমে আসছে
জেনারেশন গ্যাপ ।
গ্যাপ একটা আছে । পর পর বিষয়গুলিতে, স্তরে স্তরে উঠে যায়
শব্দ-সিড়ি, ‘সংখ্যাগুলো নিয়ে নাপিত বসে আছে,তুরিক্কি তুর্কি তর্কায় শেষ/ দেখ কেমন
লাগে ...’
‘চৌকা অথচ ভি’
এখানে একটা বিজয় মিছিল দেখতে পাচ্ছি ... পুরাতনের উপরে
নতুনের বিজয় । ভি ফর ভিক্ট্রি । ‘অনাব্রেক, চৌকা অথচ ভি/ দুঃস্থ দুঃস্থ কাকলির চাপ
/ কত খুঁড়ে আবলুশ পাই/ দুটো দিলখুশ বালিশে ঝিমোয়’। কে কি মানে করবে জানি না । কিংবা আদৌ তার মানে করার দরকার আছে কিনা কে জানে, আমার মোটা বুদ্ধিতে এটা বুঝলাম, দিল’খুশ’ হয়ে গেছে ।
এত দূর এসে মনে পড়ল ফেলে এসেছি বইয়ের প্রথম দিকের অনুপম
মুখোপাধ্যায়ের ভুমিকা (?), কৃষ্ণেন্দু মুখার্জীর ‘শূন্যের কবি’ ও বারীনদার ‘শুভেচ্ছা’ । এই সব আমি বরাবরই পড়তে ভুলে যাই । অবশ্য তারিখটা দেখে নিই একবার ।
শব্দ নিয়ে খেলা , এই বেশ দেখছি নতুন কবিতার একটা অচেনা ঢেউ
। খেলতে চাইছে সবাই । আর সব্যসাচীর খেলাটা খেলাকে কেন্দ্র করেই, সুনামীর নিরীক্ষা
কেন্দ্র । অসাধারণ শব্দচয়ন । কপিবুক ক্রিকেট ।
‘এয়তী মুসুর’
‘কস্কোর আড়ালে ফোস্কার
জ্বলন্ত ঢেউ/ আমারও নোনতা থাক ফর্ষার ঘোরে /আজন্ম... আক্রান্ত...ঐ/মিঠা দুধে ,
ভাতে’
আমার একটা জিনিস মনে পড়ে যাচ্ছে , ব্যথার একটা যায়গায় আঘাত
দিয়ে ‘মিঠা’ শব্দটা বড় কাঁদায় । তখন কাঁদতেই ভালো লাগে। মাকে একবার জিজ্ঞেস করে
দেখো ...
এ ছাড়া আরো কয়েকটই উল্লেখযোগ্য কবিতা এই বইয়ে জায়গা করে
নিয়েছে । যেমন ‘আলবেরুনী বড় একা’, ‘কবিদের ক্লাস’ আমার স্বল্প জ্ঞানের জন্য তাতে
মন্তব্য করে উঠতে পারলাম না । বেশকিছু নতুনত্ব দেখছি, কিন্ত মানে এই নয় সব পছন্দ
হচ্ছে, আর এই অনুভূতিটা আমার একান্ত আমার ।
ভালো লেগেছে ‘বন্দিনীদিউ’, ‘নয়া দেবী বৈশাখে’,’৯/১২/২০’
নামকরনে সব কবিতাই অতি আধুনিক ও সময়ের দাবী অনুযায়ী । সব্যসাচী যেমন
বাহাতের (অনায়াসে) খেলে শব্দকে জব্দ করেছেন ডান হাতের
প্রয়োগে খুশী করেছেন পিপাসিত বোদ্ধাদের, আমি এই জার্নির একটা সাক্ষী থেকে
‘পাঠকামি’তে যোগ করলাম আর একটা বই ।
পাঠকামি-৩
বই পড়ার তেমন নেশা ছিলো না, বাড়িতে বড়দার খুব সখ ছিলো বই সংগ্রহ
করা । এনে দিত । মাঝে মাঝে বাচ্চাদের বই, কমিক্স, শুকতারা, এই সব
পড়তাম । পয়সার টানাটানি থাকাতে বড়দা শারদীয় সংখ্যাগুলি বেশী সংগ্রহ করতেন, বলতেন,
সস্তায় অনেকগুলো উপন্যাস একসাথে পাওয়া যায় । সেভেন এইটে এইগুলো পড়তাম পালা করে ।
দাদা পাঠ করে শোনাত জীবনানন্দের কবিতা , বুদ্ধদেব বসুর কবিতা । তারপর যখন
মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, এই বইগুলি থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে আবিষ্কার করলাম একদিন
। দেখি, কর্মজীবনে এই সবের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে । তারপর বহুদিন কেটে গেছে । কারো
বই, কবিতা তেমন আর পড়ি না । পড়ার ইচ্ছে থাকে, কিন্তু পড়ি না, কর্মসূত্রে দূর
দূরান্তে থাকায়, আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি । এভাবেই চলতে তাহকে, চলতে চলতে কালক্রমে
ইন্টারনেটের কাছে আসি একদিন, খুঁজতে থাকি যদি কিছু বই ডাউনলোড করা যায় । একটা দুটো
ব্লগ নজরে আসে । পড়ি । এভাবেই নেটিজেন হয়ে অনেকদিন, তারপর ফেসবুক , বই পড়ার
ইচ্ছাটা আবার জেগে ওঠে । কিন্তু বই কোথায় ? বইয়ের জন্য অনলাইনই ভরষা এখন ।
একদিন নেটেই খুঁজতে খুঁজতে
আবিষ্কার করলাম , বুকপকেট । ঘরের কাছে আরশীনগর । ফেসবুকের খোজাখুঁজি করে বোঝা গেল,
অনেক শক্তিশালী ব্যক্তিত্য এর সাথে জড়িয়ে আছে । পিং করলাম, যোগাযোগ হলো, পরিচয় হলো
দোলনচাঁপা চক্রবর্তীর সাথে । তার কবিতা আলোচনা , প্রত্রিকা সম্পাদনা আগেই দেখেছি,
তার নতুন কবিতার বই ‘ঈভ, একটি ডালিমখেতের বিজ্ঞাপন’ এর বিজ্ঞাপনও দেখতে পেলাম
ফেসবুকে ।
এমনই এক ক্ষনে এবছর কলকাতা
বইমেলায় কৌরবের স্টলে দেখা হলো কবি দোলনচাঁপা চক্রবর্তীর সাথে, মিতভাষী, শান্ত,
উজ্জল ব্যক্তিত্য ; বইটি দিলেন আমাকে, লিখে দিলেন ‘পীযুষ কে’ । আমি বল্লাম একটা
বিল কেটে দিন । জবাবে বল্লেন, ‘আমি তো পয়সার জন্য কবিতা লিখি না’, বুঝতে পারলাম, কবিতার
মধ্যে তিনি কতখানি জমি করে রেখেছেন, কতটা পা ডুবিয়ে রাখলে এমন ডালিমের খেত করা যায়
। এমন মানুষের কবিতার আলাদা স্বাদ থাকবেই, বইটা খোলা যাক ।
বইঃ ঈভ, একটি ডালিমখেতের বিজ্ঞাপন – দোলনচাঁপা চক্রবর্তীর
এই বইমেলায় আমি অনেক বই
সংগ্রহ করেছি, এটাই এ পর্য্যন্ত শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদ বলে মনে হয়েছে, তেমন হয়েছে বইয়ের
বাঁধুনি । যদিও এই ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা খুব কম, তবুও বলব, রঙের ব্যবহার কবির
মুখচ্ছবিকে মনে করিয়ে দেয় । এই বইটি পাতার পর পাতা সিরিয়ালি না পড়ে আমি মাঝখান
থেকে পড়ব ।
‘ভাঙা মাস্তুল’
নামটা শুনে জাহাজের কথা মনে পড়ে, বেশকিছু জাহাজের কবিতা আমি
পাবলো নেরুদার পড়েছি । অদ্ভুত আবেশ তৈরী হয়, রহস্যময় করে তোলেন উনি । এখানে
সম্পর্কের কথা । জলের মত । প্রতিদিনকার মত বয়ে চলে, ভ্রুক্ষেপ নেই কারো, কারো জন্য
কেউ দাঁড়ায় না ।
‘অথচ জলকে ডাক দিতে দিতে
পিছিয়ে যাচ্ছে বাইচের দাঁড়;’ এভাবেই আমারও
আর একটা দিন চলে গেল ।
‘রবার গাছের স্মৃতি’
কবিতাটিতে ইলাস্টিসিটি লক্ষ্য করছি, টেনে একবার ছেড়ে দিলে
আবার নিজের যায়গায় ফিরে যায় । ফিজিক্সের সূত্রের মত কবি সম্পর্কের আরো একটি সূত্র
তুলে ধরছেন । কিভাবে জল গড়িয়ে নীচের দিকে যায় । যেতে বাধ্য হয় । মন চায়
না, তবু যেতে হয়, যেতে যেতে নানা স্মৃতি উঠে চলে আসে, নারী জীবনের বিভিন্ন বাঁকে
এসে সম্পর্কগুলো প্রশ্ন তুলে ধরে, কিন্তু কবি এই প্রশ্নে বিচলিত হয় না । দেখেছি এ
যুগের আরো কিছু মহিলা কবিদের মধ্যে যেখানে আবেগটা প্রধান, ব্যথা পেলে কেঁদে ফেলেন
। কাঁদাটা স্বাভাবিক, কিন্তু ব্যথাটাও স্বাভাবিক, অন্ততঃ ব্যথার একটা সূত্র আছে,
এই রবার গাছের স্মৃতিতে সেই বিশ্লেষনটা আমি দেখলাম ।
আর একটা মজার কবিতা হলো ‘দারুহরিদ্রা’
‘উলের নকশা বুঝে তারা
গর্ভিণী হবে । তন্তু দাও, শ্রীও দিতে পারো তাকে, বড়ো ভালো হয় সামান্য কলংক যদি
দাও’
বারুদের ভাষা মিঠা লাগে বড়, ভালোবাস হয়ে যায় । ভয় হয়, তবু
ভালো লাগে, গা ছম ছম, বড়ো ভালো লাগে । কবি বলেন
‘সমস্ত ল থেকে জল তুলে নিতে
নিতে হিমসিম কুয়ো, আলোর প্রতিচ্ছবি উড়ে যাওয়া পাখালিতে, ডালিমদানায়’
কি হয়, কি হয় । কি জানি কি হয় ।
এই বার প্রথম কবিতায় আসি, ‘কথকতা’, একনজরে বুঝতে পারি,
দোলনচাঁপার কবিতা যেখান খুশী, সেখান থেকে পড়া যায় , আজকের দিনে যে সমস্ত কবিদের
কবিতা পড়ি, মাইরি বলছি, এমন রোমাঞ্চকর দানাবাঁধা কবিতা কম পড়েছি...প্রতিটা লাইন
কোট করা যায় । আমি বিশেষ করে লক্ষ্য করছি কবি এত স্মুথ জার্নি কি করে করে, সমতলে
বয়ে যাওয়া একনদীর মত, কিন্ত তার ভাষা আলাদা, চলন আলাদা, স্থান কাল পাত্র আলাদা ।
বিশেষ বিষয় তার নেই, কিন্তু অনেক কিছুকে স্পর্শ করে । আমি মাঝে মাঝে একটা যাদুও
দেখতে পাই ।
‘যারা কামানের সামনে থেকে,
তুষারপিন্ডের শীতলতা থেকে পালিয়ে এসেছে মায়ের কাছে...’
এক বিপ্রতীপ খন্ডযুদ্ধের অমায়িক দ্যোতনা । এরকম আরো বেশ
কয়েকজন কবিকে শব্দকে বিষয়ের সাথে মিশ্রিত করে দারুন ধ্বনি তৈরী করে , কানে এসেই
শুধু লাগে না, প্রানে এসেও লাগে । কি জানি আধুনিকতার এই রুপকে ভালো বাংলায় কি বলে
।
‘দেশলাইবাতির ঘর’- আগুন কে বুকে করে কাঠ পড়ে আছে, জলের
কাছে,...এক দুফোটা ঘি বর্তমান, বালক-ব্রম্মচারী ভোল পালটে কিভাবে জল কে দূষিত করতে
পারে , সেই ভাবনা তার মাথায়, নারী সব জানে, কবিও ।
‘দূর হতে শষ্যমাদুর’ – একটা সমুদ্র দেখতে পাচ্ছি, সবুজের ।
অন্ততঃ এতদূর দিল্লি থেকে তো তাই মনে হয় ।
‘বিষাদের মুখোমুখি পার্পল
শাখাগুলো খুলে যায়/তোমাকে জড়িয়ে রাখা ল্যাভেন্ডার/রোদ হচ্ছে অচেনা হচ্ছে ঘুমের
মরসুমে’ ।
কিংবা
‘এই অতলে নদীকে নামাব কি
করে/নাব্যতা দেখবার যন্ত্রনাগুলি কাছে নেই’
ব্যাপারটা কোন ব্যাপার না, বিষয়টা কোন বিষয় না, এক গোল
বৃত্তের মধ্যে আটকে থাকা জ্যা, শব্দের জাদুটোনায় কি করে বুকের মাংসল ফাঁকে কবিতা
হয়ে যায় । কবি দোলনচাঁপা সেটাই করে দেখালেন ।
‘গোলাপি কামিজের খামার বাড়ি’ – খুঁজে পাচ্ছি মাটি , জলের
নিদারুন সম্পর্ক, কবি গুছিয়ে লিখে চলেছেন তার কবিতা যাত্রা । হয়তো তার একটি ইগলু
আছে, তারই খোঁজ চলছে । দৃশ্য রচনা, মননের পূর্ণ ব্যবহার, অবচেতন মনের প্রতিচ্ছবি,
কি জানি এর কোন গালভরা নাম আছে কিনা, আমি বলব, এত সাত প্যাচে গিয়ে লাভ কি,
প্রত্যেক কোম্পানীর ম্যানেজার আলাদা । ভালো লাগলো তাই আরো পড়ার অপেক্ষায় আছি ।
পাঠকামি-৪
প্রদীপদার সাথে তেমন পরিচয় কাহিনী নেই , বইমেলায় দেখেছি, একদুবার
কথা হইয়েছে । নতুন কবিতার স্টলের বাইরে দেখছিলাম অনেক ভীড় । একদুজন ক্যামেরা হাতে
ফটোও তুলছিলো । দাঁড়িয়ে গেলাম । সাথে সব্যসাচী, ভাস্বতী দি । ভীড়টা ছিলো প্রদীপদার
কবিতার বই প্রকাশের জন্য । সাক্ষী হয়ে ভালো লাগছিলো । কিন্তু কবিতা সম্পর্কে তেমন
কিছু মনে পড়ছে না, আগে ওনার কোন কবিতা পড়েছি ? সব্যসাচী বল্লেন, বই সবাই পড়ুক, পড়া
উচিত । হাতে পেলাম ‘সুফি রং’ । পড়ে দেখি ।
বইঃ সুফি রং – প্রদীপ চক্রবর্তী
বইটি এক নজরে ভালো দেখতে । ভিতর ও বাহিরে অন্তরে অন্তরে কি
জুড়ে আছে একটু খোলসা করি । ‘রুমানিকা’
‘বেনেবউয়ের বেনেবউ আছে/রংবাহারও একটা মানুষ/সর্বভূক ঢেউ কার
ব্রাশে ডুবিয়ে আঁচড় টানছে?’
রং থেকে এখানে একটা অবয়ব আকার নিচ্ছে, রংগুলি শরীর পাচ্ছে,
জীবন্ত হচ্ছে ছায়াছবি , প্রদীপদা একটা শরীরের মাঝে প্রতিষ্ঠা করছে প্রান । মনে হয়,
নিজের জীবনের খোঁজে, রঙের প্রতিটা প্রলেপে
নিজেকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন কবিতা যাত্রায় ।
প্রদীপদার লেখার একটা বিশিষ্ট দেখলাম বইটার যেখান থেকে খুশী
পড়া যায় । আর প্রদীপদা হয়ত সেটাই চান, মুক্তমনা পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করতে তার সময়
লাগে না। ‘চৈতিবাড়ির গানঃ১৪১৬’ , নাহ, মানে টা বুঝলাম না, পড়ে দেখিঃ
‘বিড়ালের পাশে আই-টি বাজারের
মেয়ে/এর মধ্যে মেঘ কোথাও নেই/অনুস্তনে শিশির ভেজাতে ভুলে গেছে দুধ’
এখানে ব্যস্ততার দিনে দৌড়ে চলেছি জলের সাথে, কখনো খেয়ালই
করিনি শিশিরটা জমে ছিলো ধানের শীশে, শুধু প্রজাপতির ওড়াটা আমাকে আবেশিত করে
রেখেছিলো । একটু আদর আমারও পাওনা ছিলো;
‘একটা সজীব ঘুঘুপাখির ডাক’ পড়ি
‘সে কাজ করে.../শরীরী পাওনা শুধু / পাখিরা/ দুরাশী পাখিদের
নাগাল পাওয়া ভার’ – জানি এর এক উড়াল আছে, জানতে ইচ্ছে করে ল্যান্ডিং ও আছে নিশ্চয়ই
‘পাঁজর-শলায় ঘেরা অকূল অথৈ জলে জ্বলজ্বল করছে/ শেষ পাখিটুকু...” এখানে এসে বোঝা
যায় ওস্তাদের মার শেষ রাত্রে । আরো কিছু কবিতা পড়লাম “দেউলে বাড়ি...বসত বাড়ি”,
“ইন্দ্রের ছবি”,”পৃথ্বীরাজ”, “লেখার কথা” , আসলে অনেক কবিতা ।
প্রদীপদা অনেক লেখেন, গোটা বইটাই লিখে ফেলেন, কি জানি সেটাই
হওয়া উচিত কিনা, আমার শুধু মনে হচ্ছে কন্টেন্টটা অনেক, পেট ভরে যাওয়ার পরেও বেঁচে
থাকবে । প্রদীপদা পাখি নিয়ে খুব লেখেন,
“সারাটি দুপুর /বুনোকাঁটায় ডেকে নিলো পাখির পা” বা
“আধা-শব্দের পাখি দেখি আলাদা আলাদা/আসতে দেখি /সমস্ত রাত মনচাষগুলো /নানা
মিশ্র-প্রসাদ এবং তীব্র একটা মীমাংসা” – আমি কোন মীমাংসা দেখি না, একটা খোঁজ অবশ্য
দেখি, প্রদীপদা পাখি নিয়ে ঘাটেন বটে, তবে ভিন্ন ভিন্ন কন্টেক্সট । কিন্তু প্রশ্ন
জাগে এত পাখি কোথা থেকে তিনি আনেন ?
‘জলে আবার নৌকা লেগেছে/ক্ষেতে ফসলে / জলের পাখিরা’
-প্রদীপদা শব্দজব্দও করেন । প্রকৃতিতে মিশে থাকে, আর বয়ে চলেন বাতাসের মত, অবাধ
বিচরণ তার । আমার শ্রেষ্ট কবিতা “পাহাড়িয়া মেঘ-বৃষ্টি-পাখির ১৭ টুকরো ব্যর্থতা”
‘উঁচুতে অনামা সেতু/ যা আছে পুনরায় কাঠের ভগ্নাংশেরও
নীচে/টেনেটুনে তাকে বের করো রোজ?’ এই অনামা সেতুতে আটকে যায় ভালো লাগা , বার বার
তাই প্রদীপদাও লিখে চলে রোজ রোজ । আর একটি
কবিতার কথা না বললে এই বইটির কথা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে , সেটা হলো “বদল”
“গোধুলি পেরিয়ে/লালবটফল ঝরে পড়ে বহুদিন পরে...যজ্ঞধুমে/বদল
হচ্ছে খাঁচার মধ্যে শালিক/শালিকের মাথায় ঝাঁপিভরা সুখদুঃখ...” হয়ত দিনে দিনে বদলে
যাবে এই কবিতা যাত্রা, আমার ভালো লাগায় যোগ হবে আরো অনেক বই, তবে ব্যতিক্রমী বই
হিসাবে ‘সুফি রং’ বইটি আমার অনেক দিন মনে থাকবে ।
পাঠকামি-৫
"আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে"...উমাপদ কর এভাবেই দেখেন জীবন যাত্রা কে, তিনি কবিতার সাথে জীবন মিলিয়ে এক চুমুকে পুরো পেগটা
চড়িয়ে নিয়ে বললেন, পীযূষ "কবিতা আমার কাছে একটা জার্নি "।
হোটেল ডি বেংগলে বসে কথা হচ্ছিল, আমি বল্লাম কবি
হিসাবে আপনি কি ‘নতুন না কৌরব’ ? উনি বললেন জার্নিটা উনার একার ।এত দিন ধরে উনি একাই এই যাত্রা করছেন । একটু বোঝার চেষ্টা করলাম, তরল পদার্থটা জানি
একটু একটু করে পাকস্থলীর আশেপাশে নদীর মত ঘুর্নি তৈরী করেছে, তাই জার্নিটা বোধ
হয় এবার জলপথে, আমাকে বল্লেন "নদীতে সায়ং ভেসে যায়" এই
বইটা তোমাকে আমি উপহার দিলাম । শুধু কবিতা না, তিনটি কবিতাও উনি জলের ঘোরে শোনালেন, পরিচয়টাও বাড়ল । আজ খুলেছি সেই বই ।
বইঃ নদীতে সায়ং ভেসে যায় - উমাপদ কর
'বাঁচতে চাওয়ার নাম পরিখা / খননের অপর নাম পেখম খোলা
শজারু’ ।একটু হোচট ই খেলাম
। পরিখায় । এত পথ হেঁটে এসে ভুলতে বসেছি কারা পথ বানিয়ে গেছে । শুধু হাঁটার কথা মনে রাখি
।
'একটা কোথাও দাগ, একটু পদচিহ্ন' - ধুলোর গল্পটা ভালো জমিয়ে লিখেছে উমাপদ কর । উমাদা লেখেন -
'ঘুম এখন ঘুমের ভিতর বুদ্ধ / শেকড় শুদ্ধ দ্রুম পাশ
ফিরে শুয়ে' - আমি জানি উমাদা স্বপ্ন
কে বড় ভালোবাসেন, পাঠককেও স্বপ্ন দেখান, মোড়ক খুলে ভেতর
থেকে একটা মোড়ক বের করেন... আর একটা কবিতায় আটকে যাচ্ছি...
'জল পেরোলেই ডাঙা এমন তো নয়' - ভাববার বিষয়, উমাদা কি করে এসব ভাবেন? একদিন জিজ্ঞাস করলাম । গম্ভীর ভাবে বল্লেন “বহুদিন
ধরে লিখছি তো” ...কিন্তু কিছু কামেন্ট করার সুযোগ পেলাম না । উমাদা আমাদের বয়সটা কে অনেক
আগে পার করে এসেছেন, নদীতে সায়ং ভাসিয়ে
দিয়ে বহুদূর পাড়ি দেওয়ার পর এই পাক্কা মাঝীর ও মনে হঠাৎ সংশয় দরজার ওপারটায় কী ?
'জোয়ার এলো, এইতো চারুলতা ভাসিয়ে দেওয়ার/
দেদার মদ, ফুরিয়ে যাবার আগে শেষবার বলা, নিশানাথ না?' আসলে কোথায় যাব? আটকেই তো থাকি আমরা, শুধু সময় ঘুরে ফিরে
আসে ।
'নি' কাব্যগ্রন্থ থেকে
আরো কিছু ভালো কবিতা পড়েছি, এবার যাবো 'গলুই ভর্তি আমি' তে । কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় আমি
বড় আনাড়ী পাঠক! এই কাব্য, এই বাংলা, এই কবিতা থেকে অনেক দূরে আছি...আমি
কি নিজের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি না ?
'গভীর রাতে পভার্টি লাইনের নীচে নেমে আসে চাঁদ /
কয়েকটা মোষ-মেঘ ছিঁড়ে হাঁড়িয়া তরলে তার স্ফীতি' -এ এক অন্য জার্নির
কথা আমি বুঝতে পারছি।
'বাঁশি বাজলেই আবর্জনা বেরিয়ে আসে ঘর থেকে’ -কত সহজে এই সমাজচিত্রটি
ও পাঠকের মনে উঁকি মারে । কি নিয়ে তিনি লেখেন না?
'সংখ্যার দুদিকেই গোলাপ পাঁপড়ি । তারিখের শরীর ধেবড়ে দেওয়া
শুকনো গোলাপ পাতার ক্লোরোফিল। ফিল করতে না করতেই...' -বোঝা যায়, কবি শব্দজব্দতেও মাহির । একদম ভেটেরান । 'গহনার খাদ কথায় মিশে যায়', আমি দেখেছি, কি করে এই পিত্তল
দুনিয়ার কারবার চলছে । সানি লিওনির কথাটাই বেশী করে মনে পড়ছে ।বেবী ডল সোনা হয়ে যাচ্ছে ।
এবার পড়ব 'নেত্র নয়, তিন-এ তে-তাস' - নাহ, তে-তাস কোন নদীর নাম নয় । কিন্তু উমাপদ করের সায়ং অলরেডী
মাঝ দরিয়ায় ! নদীতে সায়ং ভেসে যায় । উমদা মাঝে মাঝে একাই তার সারথী, একাই তার আরোহী, পিছুটানে কিছু স্মৃতিও খুঁজে আনেন ।
'হোলি লাগা বিদ্যুৎ তারে ঝোলা রঙ্গিন ব্লাউজটা কি
তোমারই?' - হয়ত মনে পড়ে সেই বিদ্যুৎবাহী সেই প্রথম প্রেমের পরশ ।
'কানপাশা জোড়ার একটা বুঝি চিবুকেই ঝুলে থাকে, বিন্দু বিন্দু জলের
কানপাশা' । - আসলে কি সেই অলংকার? প্রেমকেই আমরা প্রেম
করি...প্রেমের মধ্যে ডুবে থাকে ভালোলাগা ।
'নীলের আরো কাছাকাছি যাবো', - আমারো খুব নীলের কাছে যেতে ইচ্ছে করে। সেই জন্য
কবিতা পড়ি, দু একটি লাইন ও লিখি। উমা দা লেখেন কবিতা ।
'আমাকে মডেল করে নীলছোপ সাদা ক্যানভাসে মকবুল ফিদা...’ -আমি জানি হোসেন সাব এতে রাগ করবেন, কিন্তু অগনিত পাঠকের
মত এখানে তার নাম উল্লেখ না করায় আমিও ফিদা হয়ে যাই ।
বিষয়গুলো ভালো চয়ন
করেন উমাদা, নিজস্বতা আছে । আমারই সীমিত কবিতা জ্ঞান উমাদার
এই লেখাকে সার্টিফাই করতে চাইছে না, জানি না আরো কত পড়া বাকি, উমাদার এই লেখালেখি
প্রসংসার দাবী রাখে ।
পাঠকামি-৬
কিছু পাঠকামি শেয়ার করার পর বুঝতে পারছিলাম যে , কিছু কিছু
ব্যক্তি এটাকে ‘রিভিউ’ বলে ভুল করছেন। কিন্তু আমি এবার একটু
পরিষ্কার মেসেজ দিতে চাই যে এই পাঠকামি আমার একান্তই নিজস্ব অনুভুতি, এই কারনে কারো বই বিক্রি বাড়ার
কোন রকম সম্ভাবনা নাই ।
কথা হচ্ছিল কিছু বইয়ের কথা , আর কিছু কথা যেগুলো বইয়ের
পৃষ্ঠায় আটকে আছে। এইসব অনুভূতির কোন ডলার ভ্যালু না থাকা সত্বেও কিছু পাশ করা
ইঞ্জিনীয়ার ফাইল ,প্লাইয়ার, রুলার ,টেপ হাতে করে বই মেলায় ঘোরাঘুরি করছিলেন । রতনে
রতন চেনে, পাঠকে কবি । হাতে নাতে পরিচয় হলো নীলাব্জের সাথে সেই বইমেলায় । বল্লাম, আমিও একজন নরম জাতীয়
প্রযুক্তিবিদ । আমার একখানি ছোট্ট ‘ঘুমঘর’ তার হতে তুলে দিই । যবে ঘরে এসে
পাত্রখানি উজাড় করি , একি ! ভিক্ষামাঝে দু-দুখানা
‘প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায়’ !! একটা দীপকংর দার, একটা আমার !
বইঃ প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায় – নীলাব্জ চক্রবর্তী
দিল্লি ফেরার পথে ট্রেনের কামরায় এই বইটিকে এক-দুবার হাত
লাগিয়েছিলাম...সে শুধুই টাচ । আজ সে কোলের উপর । পাশে শুয়ে আছে ল্যাপটপ, অভ্র !যখন
‘উপবৃত্তের সংজ্ঞা’ থেকে
‘মাংসল সম্ভাবনাগুলো নিয়ে / লালচে বোতামবিলাস নিয়ে /
ব্যক্তিগত হয়ে যাচ্ছে’ তখন কবির অনুভূতি আর একলা থাকে না । এখানে অবশ্যই কোন নাটক
নেই, কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যায় ক্লাইমেক্সটা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে এসে সম্পর্কে মিলিয়ে
যাচ্ছে ।
‘আঙুল রাখার রাস্তা/এইভাবে/ কতটা অযৌন হয়ে যাচ্ছে’ –
নীলাব্জ , কবিতাগুলোতে কড়া রং এর দাগ বসিয়ে দেন, ছবিগুলো শিউরে ওঠে । ক্ষয় হতে
থাকে নীলু , তার অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বর মধ্যে চলতে থাকে টানা পোড়েন । উদ্বায়ী হতে
থাকে তার গণিত ভাবনা । গান হয়ে ফিরে আসে
রাত । মনে পড়ে যাচ্ছে-
“ওই নিয়মিত বালি ঘড়ির ভেতর /ফুরিয়ে আসছে /আঁকিবুকি কাটার
প্রাচীন একটা দূরত্ব” – আমি ভাবছি, কি ভাবে নীলাব্জ স্মৃতি থেকে তুলে আনে স্বর ,
ড্রিম গার্লের কথা মনে পড়িয়ে দেয় ? পড়লাম ফ্লাসব্যাক, উপবৃত্তের সংজ্ঞা, রাস্তা ।
নীলাব্জের কবিতা এর আগে বেশী পড়িনি, একটা দুটো শূন্যকালে ,
ব্যাস । কবিতায় ও কি বলতে চেয়েছে, ভাবতেই একটা মিথ ভেঙে পড়ে, কোন ধারনা হওয়ার আগেই
ধরন ফেটে চৌচির হয়ে যায় । পড়তে গিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে নিতে হয় । লাইন কখন জানি উড়াল দেয় ।
“গাঢ় হাইফেনের পাশে পাশেই কমিক রিলিফের মনোলগ/আর চাকার
পুনরাবিষ্কারের কথায়/পার্কিং লটের সমস্ত মরা ঘাসের কথা” – তোমরা যেখানেই যাও , আমি
এই ঘাসের উপর বসে থাকি। ইন্নোভেশনের ব্যান্ড বাজিয়ে নোনতা জলছাপ নিয়ে খেলা করে
নীলাব্জ চক্রবর্তী । কে ভেবেছে এই ইঞ্জিনীয়ারীয় কবিতার কথা ? ফিরে এসো চাকা ।
‘এক ফোটা নাভি থেকে একটা গ্লিসারিনের দূরত্ব / ছোট হরফের
দিকে বড়ো হরফের দিকে ...ওই রাস্তাটা ক্রমশ নভেম্ববরের দিকে চলে যাচ্ছে’ – এই
রচনাশৈলীটা আমি আগেও দেখেছি...বারীনদার কোন এক কবিতায় মনে পড়ছে না, কপি পেস্ট
লাগছে, এটা আমি এড়িয়ে আমি নভেম্বরে ফোকাসটা রাখি...
“ময়ূরী থেকে একটাই দীর্ঘ সরলরেখা ভিজে ভাব, ভাজক-ভাজিকার
ডাকনাম, এক একদিন...” ও জ্যামিতির কথা বলছিলো, অংকের কথাও ,আমার সামান্য জ্ঞানে
আমি একটু অধিবাস্তবতার ছায়া পাচ্ছিলাম । তবে এ পর্যন্ত যে কটা কবিতা আমি পড়লাম তার
মধ্য শ্রেষ্ট মনে হলো “শোকসভা থেকে ফিরে আসার পর” । এমন কবিতা কদাচিৎ চোখে পড়ে ।
এবার যাত্রা করবো সিনেমাত্রায় ।
“ক্রমশ জলের নীচে এক ফাল্গুন / সরে যাচ্ছে / শীতল পাটির
আরাম ” এর পর অনেকগুলি সিনেমার দৃশ্য পড়লাম । ধরতে পারলাম না । কিন্তু ছোঁয়া থেকে
গেলো । আরেকটি সিনেমার কবিতা হোলো “সিনেমা বিষয়ক”- বিষয়কে ধরে না, কিন্তু বক্তব্য
বলে যায় ।
“ফ্রেমের ভিতর /ফিরে আসছে আরো একটা ফ্রেম.../ আর.../ বৃষ্টি
খুলে ফ্যালা মেয়েরা /গ্রামোফোন পেরিয়ে /চিলেকোঠার ভেতর দিয়ে” – নীলাব্জ ছবির ভিতের
আর একটি ছবি আঁকে । কিছু গানের ব্যবহারে বেমালুম ঠাকুরসাব পেন্নামটা সেরে ফেলেন । ‘ছায়াপথ’ কবিতাটা -
হ্যাভোক । ‘ঋতুবদল’ – সাংঘাতিক বাঁক । ও আজকের যুগের - ‘কথা’ ।
“লিরিকবাস” – মনে হলো এক ট্রেন এমপিথ্রি লোড করে ছুটে আসছে
গান । আর
“মেরুন হচ্ছে গল্পগুলো/ ডোরা কাটছে/রা কাটছে না বাতিল /
পার্চমেন্ট কাগজের স্তুপ...” / “দিনগুলো গোল গোল হতে হতে স্তনের আকার
নিয়ে/ট্যনজেন্ট ...” আমার মনে হয়, ট্যান কথাটা চামড়ার সাথে যায় । সেখানে অংক মেলে
না । খেয়ালখুশীর জায়গা, যেকোন সময় আমি মুখ ডুবিয়ে নিতে পারি মোলায়েম মেদময় শারিরিক
ভাষায় ।
আর একটি দেখুন, “ছোটো ছোটো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কথামালা/সুর ভুলে
যচ্ছে/কামিজ কাটার জ্যামিতি” এই যে বার বার ২ডি চিত্রমালা ; কখনো নীলাব্জকে একলা
করে না...সে ঐ সব একাকীত্বের কবিতার ধার ধারে না । পাস্ট ইস পাস্ট, ও আজকের কবিতা লেখে
। ওর সঙ্গীত প্রিয়তা একটা বৈশিষ্ট, এটা
দুর্বল কিনা বলার মত কবিতা জ্ঞান আমার নেই, কিন্তু কবি এটা স্বীকার করেছেন যে ওটা
ওর কবিতায় উ-ধার হিসাবে আসে, আর ইটালিক হয়ে কাজ করে । চলুন শেষ কবিতায় একটা চুমুক
দিই।
“ভেঙ্গে ফেলা হলো/সিঁড়ি বিষয়ক যাবতীয় তথ্য/ যা আদতে এক
বাক্স বাড়ির আদলে গড়া /রুপ ও রূপক তৈরীর কারখানা/তার দেওয়ালে কান পাতলে /যুক্তি ও
প্রতিযুক্তির মাঝে হিম হয়ে যাওয়া / একটা শিকল” এটা আমার মনে হলো কবির নিজেরই
কৈফিয়ত বা কবিতা ভাবনা । কবি কি ভেবে এটাই তার বইয়ের শেষ কবিতা রেখেছেন তা আমি
আন্দাজ করতে পারলাম না । কিন্তু আরকিটেকচার অনুযায়ী তিনি যে একটি পারফেক্ট সিনপসিস
সামনে রেখেছেন এটা বলাই বাহুল্য ।
No comments:
Post a Comment