উপস্থিতি
আজ বসন্ত । কত নতুন সবুজ পাতা ! নুতন গাছও দেখি যারা পৃথিবীকে অম্লজান দেয় । ক্লোরোফিল নিয়ে অ-বিজ্ঞানীরাও
লিখে ফেলে অনেক লাইন । ফল দেয় । ফলাফল । এরকমই কিছু গাছ থেকে পড়ে যাওয়া আপেল দেখে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র কখন যে শিকড় জাঁকড়ে
ধরে । মাটি থেকে উঠে আসে ত্বরণ । উঠে আসে তারা রিখটার স্কেলে । ট্রিগার হয় । কোথা থেকে যে কি ট্রিগার হয় , না হওয়া থেকে অনুপস্থিতির
পূর্ণ অবস্থানে চলে যায় পদার্থের প্রোটন কণাগুলি । প্রশ্ন গাঢ় হয় । আমি কি আদৌ আছি ? নাকি নেই ? রাত্রে বিছানায় হাত
দিয়ে অনুভব করতে থাকি অন্ধকার কতটা কঠিন...শুয়ে থাকি এই অসীম সম্ভাবনার মধ্যে... আদৌ
কি আছি ? অস্তিত্বের একটা সংগ্রাম
হাতে, পায়ে, গালে ঠেকে । কিছুটা শূন্যের সংগ্রাম । কিছুটা আন্তঃপ্রজাতির অস্তিত্বের সংগ্রাম । কবিতা আমাকে সেখানে নিয়ে যায়
। যে আমি এক নিমেষে আমি 'আট বছর আগে'
এক মর্গে চলে যেতে পারতাম । লাশ কাটা ঘরে । এই গাঢ়তম বেদনার রক্তিম ফলে
রস হয়ে অবস্থান করতে পারতাম । প্রশ্নটা পালটায় না, এই গৃহ, শিশু, অর্থ, খ্যাতি, যশ আমাকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধক্ষত্রে ঠেলে দেয় । ব্লাকহোলের ছিদ্র থেকে অনেক
অনেক শূন্য আমি ঝুলিতে একেট্টা করব বলে আমি পায়ে পায়ে পাঞ্জাবী ট্রাকের পিছনে দৌড়াতে
থাকি। যার পেছনে লেখা থাকে “বুরি নজরবালী তেরা মুহ কালা” । ট্রাক আমাকে আমার ক্ষমতার
বাইরেও নিয়ে যায় । শতভাগের উপরেও থাকে আরো ভাগ ।... আমার আজকের কবিতা তাই আমাকে নিয়েই...
"পবনপুত্র"
। পবনকে দেখা যায়না । হাতের কাছে নড়ে চড়ে,
খুঁজলে জীবনভর মেলে না ।, কিন্তু তার অস্তিত্ব
টের পাই । আমি সেই পবনের পুত্রের কথা বলছিলাম । নামকরন করার করতে গিয়ে আমার একটি কাহিনীর কথা মনে
পড়ে । ছোট বেলায় আমি এক গল্পশুনি, হনুমানের । তার অমর হওয়ার গল্প । হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে— পবন দেবতার ঔরসে অঞ্জনা
(কেশরী নামক বানরের স্ত্রী) নামক বানরী গর্ভে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর পর তার
নাকি খুব খিদে পেয়ে যায় । ভোরের সূর্যকে তার ফল মনে হয়। মাতৃক্রোড় থেকে সে
লাফ দেয় শূন্যে । পাছে সূর্যকে খেয়ে নেয় শিশু হনুমান, ইন্দ্র বজ্রদ্বারা
হনুমানকে আঘাত করেন। ফলে পর্বত শিখরে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রের এই দশা দেখে
পবন দেবতা পর্বতগুহায় প্রবেশ করে পুত্রের
জন্য বিলাপ করতে থাকেন। ফলে বাতাসের অভাবে সমগ্র চরাচরে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। তখন সকল
দেবতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে, ব্রহ্মা বায়ুর কাছে
উপস্থিত হয়ে, হনুমানকে পুনর্জীবিত
করেন। এরপর ইন্দ্র বর দেন যে বজ্রে এঁর মৃত্যু হবে না এবং তাঁর ইচ্ছা মৃত্যু হবে। ব্রহ্মা বলেন, হনুমান ব্রহ্মজ্ঞ ও চিরজীবি হবেন এবং সকল ব্রহ্মশাপের
অবধ্য হবেন। গল্পটা এখানেই থাক, এবার
কবিতাটা দেখে নিই...
"পবনপুত্র"
পথেই পড়ে ছিলো ইলাস্টিকের মেঘ
চিলের পাখনায় জড়িয়ে জ্বারিত নিঃশ্বাস
ঘড়ির ডায়ালে কোমর বেঁকিয়ে কলম লিখছিলো
চুম্বকের আত্মজীবনী...
পোড়ামাটির পাত্রে শকুন্তলার অ্যালজেবরা
গুনিতক হারে বেড়ে যাচ্ছে
এই গ্রীষ্মে তাপ
জ্যামিতিক হারে বাড়াচ্ছি দৈর্ঘ্য
আউট অব মার্জিন
স্ট্র্যাটোসফিয়ার পার করে উড়ে যাচ্ছে গরুড়
বেলুনের পেটে বাড়ছে শিশু হনুমান
ডানা থেকে ঝরে পড়ছে রোদ
পাঞ্জাবী ট্রাকের পিছনে পিছনে
মুহ কালা করে এক একটি যক্ষ
প্রিন্ট হয়ে যাচ্ছি মাইলস্টোন থেকে মাইলস্টোন
এই
কবিতায় হনুমানের কোন কাহিনী নেই । আছে গাছ খাওয়া মানুষের গল্প । যে গাছ গুড়ি হয়ে
পড়ে থাকে আদাড়ে, বাদাড়ে, রণে, বনে, জঙ্গলে । সে খেটে হয়ে যেতে যায় না, সে বসন্ত
দেখে, পাতা মেলে দেওয়ার আকাশ । হায় ! গাছ, তবুও সে শ্রমিক নয়, সে এক প্রগতিশীল
প্রবাহ, তার গা সবুজ । প্যারেনকাইমা , স্কেলেনকাইমা জুড়ে তার আদিম মাটির টান ।
এখান থেকেই ট্রিগার হয় তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম । তার ‘ইচ্ছে’র জন্ম হয় । তাড়না ।
কিভাবে আবেশের গায়ে আবেশ লেগে লোহা চুম্বক হয়ে যায় । কিভাবে সেই চুম্বক বদলে দেয়
কম্পাসের জীবন বিচিত্রা । আকর্ষন বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে তার উত্তর বা দক্ষিন মেরু
খুঁজে নেবার তাগিদ । আর জীবনও নাছোড় বান্দা চুম্বক। যেভাবেই তাঁকে রেখে দাও , ঠিক
খুঁজে নিতে চায় তার দিক । আমিও কি খুঁজিনি আমার রাস্তা ? “চুম্বকের আত্মজীবনী” আমি এখান থেকেই পাই । আমার খোঁজ চলতে থাকে, বিভিন্ন দিক , তল ,
টান, আমি খুঁজতে থাকি তার উৎস । নাকি সেইসব
খোঁজ ছিলো ওয়ান ডি সরল রেখা? একবার একটু ত্রিমাত্রিক ছবির দিকে তাকাই । আমাকেও কি
আগে পিছে এক্স, ওয়াই জেড অ্যাক্সিস বরাবর বাড়াতে হয়নি দেহ ? ছোটবেলা থেকে হাটতে
শিখেছি তার পর দৌড়... প্রতিটা স্কুল পরীক্ষায় ক্ষমতার থেকে বেশীদূরে লাফাতে হয়েছে
। মাড়াতে হয়েছে এক অজানা লক্ষ্য । ভেঙে চলেছি প্রতিপদে এক নতুন পথ, জিন্দেগী হর
কদম ইক নয়ী জংগ হে ।
কাজটি
কোন মানুষের কাছেই সহজ ছিলো না । গুহা মানবের কাছেও না । এখানে এই লাইনটি তাই অবধারিত ভাবে এসেছে “চিলের পাখনায় জড়িয়ে জ্বারিত নিঃশ্বাস” । প্রতিটা জার্নির পর নিজের নিঃশ্বাসের
শব্দ অনুভব করেছি । এই শব্দ শোনা যায় কি ? নাকি খামখেয়ালী এই সব অনুভুতি ? তাই বলে
বালতিতে টানিনি কি জল, হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল, কোমর বেঁকিয়ে কুপিয়ে দেখিনি কি দু-হাত কোদাল...? হ্যা, নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় । “কোমর বেঁকিয়ে”
শব্দটা আমার এই বিষয় ভাবনা থেকে লেখা ।
আমাদের
দেশে অনেক গণিতজ্ঞ জন্মেছেন । খ্যাতি আছে ‘রামানুজন’,’রাধানাথ সিকদার’,’সত্যেন
বোস’ ইত্যাদী। আমি একজনের নাম জানি ‘শকুন্তলা’ যিনি এই সব গনিতজ্ঞের মধ্যে পড়েন না
। কিন্তু তিনি নাকি কম্পুটারের থেকেও তাড়াতাড়ি অংক কষে দেন । আমার কাহিনীর সাইডরোলে
তাঁকে আমি আজ ইনস্টল করছি । মানুষের
সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে । মানুষ তার প্রতিকূলতা কে বশ মানিয়ে বেঁধে ফেলছেন ঘর । এই
একবিংশশতাব্দীতে এসে এই লড়াইটা সাংঘাতিক মোড়ে এসে দাড়িয়েছে । আমরা পিরামিড
বানিয়েছি, ব্যাবিলনের ঝোলান উদ্দ্যান সৃষ্টি করেছি, বানিয়েছি চীনের প্রাচীর ।
ভালোবসে শ্বেত পাথরে খোদায় করেছি তাজমহলের নাম । আজ আমরা কম্পিউটারের আবিষ্কারের
পর খুলে ফেলছি এক বিশ্ব থেকে আরেক বিশ্ব ...জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এই অগ্রগতি ।
আমাদের সভ্যতা সমস্ত প্রতিকুল অবস্থা কে নালিফাই করে আগে বেড়ে যাচ্ছে, আমাদের এই
জার্নি পথ রেখা বর্গক্ষত্রে ও তার চার দেওয়ালের সীমানা দিয়ে আবদ্ধ করা যাচ্ছে না ।
এ-ফোর (A4) কাগজে আমরা সাধারনত প্রিন্ট আউট নিই। সেই প্রিন্ট আউটের একটা
মার্জিন থাকে, সেই মার্জিনের মধ্যে কন্টেন্টগুলি প্রিন্ট হয় ।সেই প্রিন্ট এরিয়ায়
আমারা প্রতিদিন আমাদের এই ডিউটি অনুযায়ী যে যার মত প্রিন্ট করে আসছি । কিছু লোক
সেই প্রিন্ট এরিয়ার বাইরেও প্রিন্ট করার কথা ভাবেন । ‘আউট অব প্রিন্ট এরিয়া’
থেকেই আমার এই ‘আউট অব মার্জিন’ নেওয়া । আর সত্যিই তো, নিজে কতবার
প্রিন্ট হয়ে গেছি । এরিয়া বেড়েই যেতে থাকে এই ক্রমবর্ধমান গতিতে, একে ত্বরণ বলে
অভিহিত করা যায় না ।
আসলে,
এই জার্নিটা বেলুনের মত । যতই হাওয়া ভরো, বাড়তেই থাকে । অলটিচুড বাড়তে থাকে । পবনপুত্রেরাও বেলুনের পেটে বাড়তে থাকে । আমাদের
ত্রিমাত্রিক সাইজ বাড়াতেই থাকে । আর আমরা আরো আরো উপরে উঠতে থাকি । এই বেলুন ওড়ানো
নিয়ে আমার আরো একটা কথা মনে পড়ে...তখন আমি বিমান বাহিনীতে কাজ করি। অল্প বয়স । আমি
‘বেস অপসে’ কাজ করতাম, তার পাশেই ছিলো ‘মেট’ অফিস। ওরা আমাদের ‘আবহাওয়া’র খবরা খবর
দিতো । কি ভাবে? একটা উদাহরন দিই;
ফোন
উঠালাম
“হেলো,
মেট, হোয়াট ইস দা ওয়েদার এট জম্মু এট টুইয়েল্ভ ?’
জবাব
এলো,
“জিরো
ওয়ান জিরো / ওয়ান জিরো সিক্স, ফেয়ার ,ক্লাউডস
নিল, থার্টি থ্রি ডীগ্রি, কিউ এন এইচ ওইয়ান জিরো ওয়ান ফাইভ’
এটাকে
ডিকোড করলে এরকম দাঁড়ায়, এই কবিতাতে তৃতীয় লাইনে লেখা ঘড়ির কম্পাসটা বের করো । এতে
তিনশো ষাট ডিগ্রি অঙ্কন করা আছে । জিরো ডিগ্রীটা নর্থ ।কম্পাসটা নর্থ আলাইন করে
“জিরো ওয়ান জিরো” ডিগ্রিতে তাকাও । হাওয়াটা ওই দিক থেকে আসছে । আর ঘন্টায় “ওয়ান জিরো” মানে দশ
কিলোমিটার বেগে বইছে । খালি
চোখে তাকালে ‘সিক্স’ কিলোমিটার পরিষ্কার দেখা যায় । ‘ফেয়ার’ মানে, মোটামুটি ভালো
আবহাওয়া । কোন মেঘ নেই আকাশে, বাতাসের চাপ ১০১৫ । জানি এই গল্পটা জমল না , কিন্তু
প্রশ্ন হলো ‘মেট’ অফিস এই এতো ইনফর্মেশন গুলো জানতো কি ভাবে ?
ওরা বেলুন উড়িয়ে দিতো । বেলুনে হাল্কা হিলিয়াম গ্যাস ভরে দিয়ে । বেলুন উড়ে যেত আপন খেয়ালে । আমি দেখতাম
তাকিয়ে । যতদূর আমার ছোটবেলার পতেঙ্গা ঘুড়ি না যেত, এই বেলুনগুলি তার আরো অনেক
উপরে উড়ে যেত । মেঘের খুব কাছে । মেখের নরম বুকে ডুবে যেতে যেতে ওই বেলুনরা জানতে
দিত যে বাতাসের বেগ কি ।
কি তার ডিরেকশন । কি মাত্রায় তাপমাত্রা ওঠানামা করে । তাকিয়ে থাকতাম । আমি ভাবতাম,
আমরা এই কত দূর উঠে এসেছি বেলুনের সাথে । সত্যি তো, আমরা বাতাসের বেগ ও দিক দেখে
এরোপ্লেনের গতিও নির্ধারন করছি ।
হাজার হাজার আকাশযাত্রীরা আমাদের সাথে উড়ছে । সমগ্র মানব জাতি উড়াল দিয়েছে । আমরা
আরো একটা কীর্তিমান পৃথিবীর বুকে কায়েম করলাম । জানি এই যাত্রায় বেলুনদের ইলাস্টিক
হয়ে অনেক গুন ফুলে যেতে হয়েছে । কিন্তু এ যাত্রা প্রিন্টও করে গেছে আর এক বিজয় কাহিনী । আমাদের
প্রত্যেকটা জার্নি এক একটা নতুন মাইলস্টোন । “প্রিন্ট হয়ে যাচ্ছি মাইলস্টোন থেকে মাইলস্টোন” এই লাইন টি আমার এভাবেই এসেছে । এই যাত্রায় আমারও ব্যক্তিগত যাত্রার অভিজ্ঞতা
মিশে আছে । পথ কে ভাগ্য বলে মেনে নিইনি , হাইওয়ে বানাতে চেয়েছি । অস্তিত্বের
সংগ্রামে আমিও ডুবিয়েছি পা । বসন্ত ফিরে গেলে রণক্ষত্র জুড়ে বৃষ্টি আসুক এবার ।
শিকড়ে শিকড়ে বৃষ্টি কণারা জানান দিক শ্রাবন এসেছে ।গাছ বেঁচে থাক । এখানে থাকা বা
না থাকাটাই প্রাকৃতিক ।
কোন
রচনা শৈলী এতে আছে কিনা, কোন ধ্বনি মন্ত্র কানে বা প্রানে আঘাত করবে কিনা সত্যিই
ভাবিনি, সুক্ষতার কথা কখনো মাথায় আসেনি । এই সব যাত্রা কাহিনীতে ঘামের উপস্থিতি
আমি উপস্থাপন করতে চেয়েছি , কতটা কবিতা হয়েছে সে বিষয়ে আমার মাপ জানা নেই, কবিতাটি
আমি আমার “ঘুমঘর” গ্রন্থটিতে স্থান দিতে পেরে অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি । আপনাদের
পাঠপ্রতিক্রিয়া আমার ভাবনার থেকে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জানতে আগ্রহী থাকব ।
No comments:
Post a Comment